গল্প- একটি_আহ্বান

 লেখা: #Masud_Rana


 যে দোকানে দীর্ঘ ১৬ বছর নিষ্ঠার সাথে কর্মচারীর চাকরি করেছে মঈন মিয়া, সেই দোকান থেকেই ৪ লক্ষ টাকা চুরি করে এক রাতে সে উধাও হয়ে গেল। বিষয়টা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না কেউ। এমন কী সেই পাইকারি মুদি মালের দোকানের মহাজন নেসার ব্যাপারীও হারানো টাকার কথা উল্লেখ করে একটা জি.ডি. করলেও সেখানে মঈন মিয়ার নামে চুরির অভিযোগ করলেন না। তার ভাষায় মঈন মিয়া টাকা চুরি করার লোক না। মঈন মিয়াকে তিনি আপন কাকা মানেন। ঈদের কয়েক দিনে পাইকারি মুদি মালের দোকানগুলোতে বিক্রি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সেখান থেকেই ৪ লক্ষ টাকা চালের চালানের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তিনি নিজে এত বছরের বিশ্বাস থেকেই টাকা গুলো তুলে দিয়েছিল মঈন মিয়ার হাতে। 


বাজারের অন্য সব লোকেরাও মঈন মিয়াকে একজন সৎ কর্মচারী হিসেবেই চেনে। সে কেন শেষ বয়সে এসে এমন কাজ করবে! মঈন মিয়ার টাকার খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। অনেক আগেই স্ত্রীকে হারায় সে। নিজের মা আর সে দায়িত্ব নিয়েই বড় করে তোলে তিন মেয়েকে। খুব একটা পড়াশোনা করাতে না পারলেও তিনজন ভালো পাত্রের হাতে তাদের সমর্পণ করে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা পালন করেছে সে। মঈন মিয়ার মাও মারা গিয়েছে ২ বছর হলো। এখন একাই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতো লোকটা। পিছুটান কিংবা উচ্চাসা এই লোকটার জীবনে কিছুই ছিল না।


তাই সে যে চুরি করেনি সেটা নিয়ে সকলে নিশ্চয়তা দিচ্ছে। আবার মঈন মিয়ার টাকা সহ উধাও হয়ে যাওয়ার হিসাবও কেউ মিলাতে পারলো না। তার তিন মেয়ে ছুটে আসে বাবার নিখোঁজের কথা শুনে। তাদের কারো কাছেও যায়নি লোকটা। যত জায়গায় খোঁজা সম্ভব সব জায়গাতেই খোঁজ নেয়া হলো তার। কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেল না তাকে। 


এর একটা খারাপ ইঙ্গিতও রয়েছে। যা ভেবেই সকলে দুশ্চিন্তা করছে বেশি। মঈন মিয়াকে হত্যা করে কেউ তার থেকে টাকা গুলো ছিনিয়ে নিয়েছে। এতগুলো টাকার কথা জেনে নিম্নবিত্ত যে কোনো লোভী মানুষের পক্ষে কাজটা করা অসম্ভব নয়। যদিও মঈন মিয়ার কাছে টাকা রাখার কথাটা কাউকেই তেমন ভাবে জানায়নি মহাজন নেসার বেপারী। তবুও টাকার কথা বাতাসে ছড়ায়। মঈন মিয়ার সেরাতে গোডাউনেই ঘুমানোর কথা ছিল। দোকানের কোনো কর্মচারীও করতে পারে কাজটা!


পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে সবাইকেই। কিন্তু কোনো তথ্যসূত্রই পায় না। প্রায় মাস খানিক কেটে যাওয়ার পরেও মঈন মিয়ার কোনো খোঁজ মিলল না। সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তাও কেউ জানে না। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে চঞ্চলতা কমে যেতে লাগলো বড় বাজারে। 


এক রাত। পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন নেসার ব্যাপারী। তার মুদির দোকানটা বড় বাজারে হলেও আদি ভিটা এখনো ছাড়েননি তিনি। গ্রামীন এক পরিবেশের ভেতরেই তার বসতবাড়ি। দুই পাশে ধান ক্ষেত তার মাঝের যে রাস্তাটা ধরে হাঁটছেন তিনি সেটার শেষ মাথাতেই তার বাড়ি। রাতে এদিকে রিকশাওয়ালারা আসতে চায় না। রাস্তার শুরুতে তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে বেটা। তিনিও অন্যদিনের মতো ঝগড়া করলেন না। জোৎস্নার আলোতে, ফুরফুরে বাতাসে তার হাঁটতে খারাপ লাগবে না। অনেকটা পথ হেঁটে আসার পর তার মনে হলো কিছুক্ষণ ধরে কেউ তাকে অনুসরণ করছেন। পেছনে ঘুরে ভালোমতো তাকালেন তিনি। কেউ নেই। আরেকটু হেটে যাওয়ার পর আবার ঠিক একই রকম একটা অনুভূতি হওয়ায় আবার পেছনে ঘুরে তাকালেন তিনি। 


দূরে একটা বৃদ্ধ লোককে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলেন তিনি। লোকটা যেন হওয়ায় ভেসে  এসে উপস্থিত হয়েছে। তিনি গলার স্বর চওড়া করে চেঁচালেন, 'কে মিয়া ভাই? পরিচয়?'


লোকটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। কাছে আসতেই তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। মঈন মিয়া! কেমন মন মরা, ফ্যাকাসে চেহারা হয়েছে তার। এক মাস নিখোঁজের পর কোথা থেকে উদয় হলো! তিনি ছুটে কিছুটা এগিয়ে গেলেন সামনে, 'মঈন কাকা!'


মঈন মিয়ার আর্দ্র কন্ঠ, 'বাজান!' বলে ফুঁপিয়ে উঠল।


নেসার ব্যাপারী বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'কই ছিলা তুমি কাকা! খুঁইজা হয়রান আমরা!'


মঈন মিয়ার কণ্ঠে সেই একই সুর, 'বাজান! ও বাজান!'


'কী হইছে তোমার, কাকা!'


'বাজান ! ও বাজান! বাজান গো!' ফুঁপিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো বৃদ্ধ মঈন মিয়া। আর কোনো শব্দই উচ্চারণ করছে না সে ওটা ছাড়া। বিহ্বল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন ব্যাপারী। বয়স্ক মানুষের এমন আচরণে তার মনটাও কেমন সিক্ত হয়ে উঠল। বললেন, 'ওই টাকার কথা ভুইলা যাও কাকা! যা গেছে গেছে! এখন লও বাড়িতে! কয়ডা খাইয়া জিরাও। চেহারা তো শেষ হইয়া গেছে গা তোমার!'


'বাজান ! ও বাজান!' বৃদ্ধ যেন কষ্টে ভুগে আকুতি করছে তার কাছে কিছু একটা।


নেসার ব্যাপারী এগিয়ে গেলেন বৃদ্ধের দিকে। তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেবেন। লোকটার গা স্পর্শ করতে গিয়ে তার হৃদপিণ্ড যেন লাফিয়ে বুক ছিড়ে বের হয়ে আসতে চাইলো। কোথায় মঈন মিয়ার শরীর! তার হাত মঈন মিয়ার শরীর বেদ করে বাতাস কেটে বেরিয়ে এলো। কোনো শরীর নয় তার সামনে, দাঁড়িয়ে আছে মঈন মিয়ার অবয়ব। তিনি আৎকে উঠে পিছিয়ে গেলেন। 


মঈন মিয়া মারা গিয়েছে! আর তার প্রেতাত্মা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে পেরেই তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ইচ্ছা করলো উল্টো ঘুরে দৌড় দিতে বাড়ির দিকে! নিজেকে কিছুটা সংযত করে বললেন তিনি, 'কেমনে হইলো এসব, কাকা? কে করলো?'


এবার বৃদ্ধ মঈন মিয়ার মুখে ক্রোধ ভর করলো, 'বাজান! ও বাজান! বাজান গো!' 


বিস্ময় নিয়ে ব্যাপারী তাকিয়ে রইলেন মঈন মিয়ার দিকে। মঈন মিয়াও করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। হঠাৎ সে হাত ইশারা করে ঘুরে রাস্তার পাশ থেকে ধান ক্ষেতের আইলে নেমে পড়লো। একবারও পেছনে না তাকিয়ে হাঁটতে লাগলো সোজা। নেসার ব্যাপারী দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পিছু নিলেন প্রেতাত্মাটার। কেন যেন মনে হচ্ছে বৃদ্ধ মঈন কাকা তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। একদম সাধারণ মানুষের মতো হেঁটে চলেছে লোকটা। তবুও এক আতঙ্ক ঢেকে রেখেছে যেন পরিবেশটাকে।


বুকে সারাক্ষণ ধুকপুকানি নিয়েও কী একটা নেশায় হেঁটেই চললেন তিনি তার এক সময়ের বিশ্বস্ত কর্মচারীর পিছু পিছু। হাঁটতে হাঁটতে এসে তিনি হাজির হলেন ধান ক্ষেতের শেষের এক পুরোনো ডোবার কাছে। বিস্মিত হয়ে খেয়াল করলেন বৃদ্ধ মঈন মিয়া নেই কোনোখানে! শূন্যে মিশে গেছে!জোৎস্নার আলো,পরিত্যাক্ত এই ডোবার পানির পঁচা গন্ধ আর অদ্ভুত শুন-শান নীরবতা তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুললো। শরীর গুলিয়ে উঠল তার। চারপাশের সব কিছু  কাঁপতে লাগলো তার দৃষ্টিসীমার। কম্পিত দৃশ্যেই ডোবার দিকে চোখ  পড়তেই দেখলেন ডোবার পানির একটা অংশে বুদবুদ উঠছে।  আচমকা ওখান থেকে ভেসে উঠল একটা মানুষের শরীর! মাথা থেতলে ঘিলু বেরিয়ে গেছে ওটার। নাক-মুখ মিশে গেছে খুলির সাথে। হাত-পা কুণ্ডুলি পাকিয়ে রয়েছে পেটের সাথে। ভয়ঙ্কর একটা লাশ! ওটার চোখ খুলে গেল হঠাৎ। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে। মঈন মিয়া! সেই মায়াবী করুণ দৃষ্টি! লাশটার ফুপানো কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো, 'বাজান! ও বাজান! বাজান গো!'


আর কিছু ভাবতে পারলো না নেসার ব্যাপারী। উল্টো ঘুরে ছুটতে লাগলেন রাস্তার দিকে উন্মাদের মতো। প্রতি মুহূর্তে পেছন থেকে তার কানে ভেসে আসতে লাগলো যেন সেই করুণ আহ্বানেরকম্পন, 'বাজান! ও বাজান!'


মঈন কাকা ভালোবেসেই তাকে 'বাজান' বলে ডাকতো। একরাতে এই সুন্দর পুত্রসম সম্বোধনটাই যে তাকে এতটা ভয় পাইয়ে তাড়া করে বেড়াবে কোনোদিন মাথায় আসেনি তার। 


ছুটতে ছুটতে বাড়িতে যখন তিনি পৌঁছালেন তখন তার দেহ আর মন শক্তির শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে। চিৎকার করে একবার স্ত্রীর নাম বলে ডেকে জ্ঞান হারালেন তিনি। 


পরদিন নেসার ব্যাপারীর কথামতো সেই ডোবায় অনুসন্ধান করা হয়। এবং সকলেই আশ্চর্য্য হয়ে যায় একটা পঁচা-গলা লাশ খুঁজে পেয়ে। সবচেয়ে বেশি অবাক হন নেসার ব্যাপারী নিজেই। লাশটা যে মঈন মিয়ার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পুলিশ লাশটা নিয়ে যায়। কিন্তু তখনো খুনি কে তা অধরাই রয়ে যায়। 


এরপর থেকে নেসার ব্যাপারীর জীবনে কিন্তু নেমে এলো এক অভিশাপ। শব্দের আহ্বানের অভিশাপ। তিনি ঘুমের ভেতর, জেগে থেকে প্রায়ই কানের পেছন দিক থেকে সেই শব্দটা ভেসে আসছে শুনতে পান। মঈন মিয়ার সেই করুণ কণ্ঠের মায়াবী সম্বোধন, 'বাজান!ও বাজান! বাজান গো!' তার মনে হয় এই শব্দগুলোই তাকে পাগল বানিয়ে দেবে। কাউকেও ভয়ের এই কথাটা না জানালেও তার ব্যবসা, পরিবার সব কিছু থেকে মন উঠে যেতে থাকে তার। তীব্র মানসিক যন্ত্রনায় ভুগতে লাগলেন। 


একদিন তিনি খেয়াল করলেন 'বাজান' বলে তাকে মঈন কাকা নয় শুধু। আরেকজনও ডাকে। তার মেজ ছেলে আমজাদ ব্যাপারী! যাকে সে কয়েক মাস আগে বাড়ি ও দোকান থেকে এক প্রকার বেরই করে দিয়েছিলেন। বদ বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে দোকান থেকে প্রায়ই টাকা সরাতো তার অগোচরে সে। মঈন মিয়ার সাহায্যেই অবশ্য একদিন হাতে নাতে ধরেন তিনি ছেলেকে। গত কয়েক মাসে দোকান থেকে ৫০ হাজার টাকা সরিয়েছে ছেলের স্বীকারোক্তি পেয়ে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন তিনি। জুতা মারতে মারতে মারতেই বাজারের সবার সামনে দোকান থেকে বের করে দেন তাকে। বাড়িতে ঢোকার নিষেধাজ্ঞা জারী করেন।


আমজাদ কী কাজটা করেছে! তার সঙ্গে ভুলেও ঐ অপমানজনক ঘটনার পর থেকে দেখা করে না ছেলেটা। তবে তিনি লোক মারফত শুনেছেন কয়েক সপ্তাহ হলো একটা গরুর খামার শুরু করেছে ছেলেটা বাছুর গরু নিয়ে। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে বলে, বন্ধুদের সাথে শেয়ারে কিস্তি নিয়ে শুরু করেছে আমজাদ ওটা। তখন অতো পরোয়া করেননি তিনি। কিন্তু এখন সব কিছু যেন পরিস্কার হতে লাগলো। আমজাদের খামারের টাকার উৎস আর মঈন মিয়ার টাকা সহ উধাও হয়ে যাওয়ার হিসেব যেন মিলে গেল। 


তার স্ত্রীকে সরাসরি বললেন তিনি। আমজাদ খুন করেছে মঈন মিয়াকে আর হাতিয়ে নিয়েছে টাকা। তিনি পুলিশে যাবেন। তার স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, 'ছোট মানুষ ভুল করে ফেলেছে! ওরে তুমি মাফ করে দাও! তোমার নিজের পুলা! ওয় খুন করতে চায় নাই! টাকা চুরি করতে চাইছিল শুধু! বুড়া মঈন মিয়াই ওরে চিন্না ফেলে আর চেঁচামেচি করা শুরু করে। ভয় দেখায় পুলিশের! ওর বন্ধুরা খেইপা গিয়া কাজটা করে। মাফ করো তুমি!'


স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। তিনি কেবল সন্দেহ করেছিলেন ব্যাপারটা। কিন্তু তার স্ত্রী সব জানতো আগে থেকেই! ছেলেটা নিশ্চই এসে বলেছে তাকে।তার ধারণাই ঠিক! তার ছেলেই তবে খুনি! মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল তার। গোলমাল ঠেকতে লাগলো সব কিছু। তার নিজের ছেলে! এসব দুশ্চিন্তার মাঝেও কানের কাছে ফিসফিসানি সেই শব্দ এখনো নিস্তার নেয়নি। বেজেই চলেছে মঈন মিয়ার কণ্ঠে, 'বাজান! ও বাজান! বাজান গো! বাজান রে বাজান! বাজান! বাজান!'


তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি জানেন তার মেজ ছেলে খুনের শাস্তি না পেলে এই করুণ শব্দটা থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তার নিস্তার নেই। কিন্তু যত যাই হোক আমজাদ তার ছেলে! দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে কাটতে লাগলো তার দিন। তার দ্বিধা দূর করে দেয়ার জন্যই যেন তার কানের কাছে দিন রাত অবিরাম ভাসতে সেই ডাক, 'বাজান, ও বাজান!' 


(সমাপ্ত)

গল্প- মধ্যরাতের_আতঙ্ক

 লেখা: #Masud_Rana


কোনো বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকলে নাকি সেখানে খারাপ কিছু এসে থাকা আরম্ভ করে। আজকাল এসব বিশ্বাস করা হয় না। আমিও এসব বিশ্বাস করতাম না, যদি অফিসের কাছাকাছি হওয়ায় সেই পরিত্যক্ত বাড়ির পাশের ছাপড়া ঘরটা আমাকে ভাড়া নিতে না হতো। ঘরটা বেশ পছন্দ হয়েছিল স্বল্প বসতির এলাকায় হওয়ার জন্য। ঘরে ওঠার কয়েক দিনের ভেতরেই সব গোছগাছ করে নিলাম। একা থাকি, নির্ঝঞ্ঝাট সব কিছু। সপ্তাহ খানিক স্বাভাবিক ভাবেই কাটলো। এরপর এক রাতে রোজকার মতো অফিস থেকে ফিরে সব কাজ শেষ করে দরজা-জানলা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাতে হঠাৎ জানলায় টোকা পড়ার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল।


ঘড়িতে দেখলাম রাত ১২ টা ২৬। ঘরের একমাত্র জানলাটা আমার খাটের সঙ্গে প্রায় লাগোয়া, ঘরের দরজার মুখোমুখি উল্টো পাশে। কে ডাকছে ঘরের পেছন থেকে! যদ্দুর দেখেছি জানলার ওপাশে মানুষহীন পরিত্যক্ত বাড়িটা ছাড়া আর কোনো ঘর নেই। বিরক্তি নিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে রইলাম। টোকার শব্দ বদলে এবার কারো জোরে জোরে থাপড়ানোর কারণে জানলাটা ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। অতি প্রয়োজনের তাগিদে কেউ যেন জানলা খোলার আহ্বান করছে। আচমকা অপ্রত্যাশিত এই ঝনঝন শব্দে বুকটা কেঁপে উঠল। ওপাশে যেই থাকুক বেশ অধৈর্য। ক্রমাগত ঝনঝন করে কেঁপেই চলেছে জানলাটা। জানলা খোলার আগে আমি গলার আওয়াজ কিছুটা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'কে ভাই?' সঙ্গে সঙ্গে জানলার কম্পন থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। কোনো সাড়া-শব্দও নেই। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, 'কী চাই?' আমি জানলা খুলবো কি খুলবো না ভাবছি এমন সময় আমার বুক কাঁপিয়ে দিয়ে আবার ঝনঝন করে কাঁপতে লাগলো জানলাটা। খুব জরুরী প্রয়োজন ছাড়া এমন করে এত রাতে কেউ ডাকবে না! আমি বিছানা থেকেই জানলার তিনটা পার্টের মাঝখানেরটা ধীরে ধীরে খুলে দিলাম। উৎসুক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকালাম।


কিন্তু কেউ নেই জানলার সামনে। আশ্চর্য্য! এর অর্থ কী! বালিশের পাশ থেকে টর্চটা তুলে হাত বাইরে বের করে আলো এদিক সেদিক ঘুরলাম। কেউ নেই! জানলাটা বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়লাম। দশ মিনিট কেটেছে বোধ হয় চোখ পুরোপুরি লাগেনি। আবার জানলায় টোকার আওয়াজ পড়লো, পরের মুহূর্তেই ঝনঝন করে কাঁপতে লাগলো ওটা। এবার প্রচণ্ড রাগ হলো। জানলা খুলে বাইরে তাকালাম। সেই একই অবস্থা। কেউ নেই। এবার বিরক্তির পাশাপাশি রাগও অনুভব করলাম। এত রাতে কেউ রসিকতা করছে আমার সাথে! টর্চ হাতে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মৃদু চাঁদের আলো, উঠানের বাল্বের আলোতে ফকফকা হয়ে আছে চারপাশ। এই ছাপড়া ঘরের উল্টোমুখে বাড়িওয়ালাদের থাকার ঘর। ওদের ঘরের সব বাতি বন্ধ। শুনশান একটা ভাব। আশেপাশের সব বাড়িগুলোরও একই অবস্থা। সামনে একটা লাঠি পড়ে থাকতে দেখে কী মনে করে তা হাতে নিয়ে ঘরের পেছনে চলে এলাম। উৎসুক ভাবে এদিক-সেদিক আলো ফেলে খুঁজে দেখলাম, কিন্তু কারও অস্তিত্বই পেলাম না।


বিরক্তি নিয়ে ঘরে ফিরে আসবো, হঠাৎ খেয়াল করলাম ওদিকের পরিত্যক্ত দু-চালা বাড়িটার বারান্দার লাগোয়া ঘরটায় বাতি জ্বলছে। কিছুটা অবাক হলাম। কারণ যতটুকু জানি এই বাড়িটা দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। তাছাড়া এতক্ষণের ভেতর কয়েকবার বাড়িটার দিকে চোখ পড়েছিল আমার। কিন্তু আলোটা আমার চোখে পড়েনি। আমার ঘরের জানলা দিয়ে তাকালেও পুরো বাড়িটা দেখা যায়। তখন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েও আলোটা দেখিনি। বাড়িতে কেউ উঠেছে বোধ হয়! টর্চের আলো গেটের উপর ফেলতেই অবাক হলাম। সেই আগেকার মতোই বড় পিতলের তালাটা লাগানো আছে ছিটকিনিতে বাইরে থেকে। ওই রুমে তালা না খুলে কেউ ঢুকতে পারবে না। কেমন একটা সন্দেহ হলো।


আমি সন্তর্পণে বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলাম। বারান্দার ঘরটার একটা কাঠের জানলা বাইরের দেয়ালের দিকে। ওটায় ধাক্কা দিয়ে জানতে চাইলাম, 'কে ভেতরে?' কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম ভেতরে কারও নড়াচড়ার শব্দ শুনে। খানিক পরেই খটখট আওয়াজ করে ওটা খুলে গেল। একটা মেয়ে উৎসুক মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার উৎসুক চাহুনিতে কেমন অভিভূত হয়ে পড়লাম আমি। কম্পিত কণ্ঠে বললাম, 'ইয়ে মানে এই বাড়িতে কেউ থাকে বলে জানতাম না, আলো জ্বলছে দেখে অবাক হয়ে এখানে এলাম।'


মেয়েটা হাসিমুখে বলল, 'আজই আমরা এলাম! কিছুক্ষণ আগে।'


'কিন্তু গেট বাইরে থেকে তালা দেয়া যে!'


'কই?'


আমি ঘুরে বাড়ির গেটের দিকে আলো ফেলেই বিস্মিত হলাম। একটু আগেও দেখলাম বাইরে থেকে তালা দেয়া কিন্তু এখন তালার কোনো চিহ্ন নেই। গেটটা সামান্য ফাক হয়েও আছে। মেয়েটার মুখ এখনো হাসি হাসি। বলল, 'এর আগের বার যখন এসেছিলাম আপনাকে তো দেখিনি! নতুন প্রতিবেশী নাকি আপনি!'


'ইয়ে মানে ওই ঘরটায় এক সপ্তাহ হবে উঠেছি। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। কত রাত!' অপ্রস্তুত ভাবে জবাব দিলাম।


'জানলায় কারো ধাক্কার আওয়াজ পেয়ে বেরিয়েছিলেন বোধ হয়!'


আমি সামান্য মানসিক ধাক্কা খেলাম। 'আপনি জানলেন কী করে?'


'আমিও যে ঝনঝন শব্দ শুনে জানলা খুলে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। আপনার জানলার পাশে একটা অদ্ভুত ছায়ার মতো কালো কিছু দেখে ভয় পেয়ে আবার জানলাটা বন্ধ করে দিয়েছি। তারপর আপনি এলেন!'


অদ্ভুত এক ভয়ের শিহরণ অনুভব করলাম আমি। মেয়েটা বলল, 'এসেছেন যখন ভালোই করেছেন, একটা উপকার করে দিয়ে যান। ভেতরে আসুন।'


এই বলে জানলাটা বন্ধ করে দিল খট করে। পরমুহূর্তেই বারান্দার বাতি জ্বলে উঠল। গেটটার অর্ধেক নিশ্ছিদ্র লোহা আর বাকি অংশ গ্রিলের হওয়ায় বারান্দার আলো গেট বেদ করে বাইরে আসছিল। আমি হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এরপর প্রবেশ করলাম ভেতরে।


পরিত্যাক্ত বাড়ি বলতে এটা খুব সাদা-মাটা একটা দু-চালা বাড়ি। দুটো বেডরুম পাশাপাশি। রুম থেকে বের হলেই ডান পাশে বাথরুম ঘর এবং বাম পাশে আরেকটা ছোট ঘর। যেই ঘরের জানলা খুলে মেয়েটা আমাকে আহ্বান করলো।


বারান্দার ঘরটিতে উকি মেরে দেখলাম মেয়েটি নেই। আশ্চর্য্য! ডান পাশের বেডরুমের ভেতর থেকে ডাক এলো মেয়েটির মিষ্টি কন্ঠ থেকে, 'ভেতরে আসুন!' আমি কিছুটা সংকোচ নিয়ে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। ঘরের বাল্ব বন্ধ। টর্চের আলোতে ঘরটা ভরে উঠল। আমার থেকে কয়েক হাত দূরেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা এগিয়ে এসে একটা চেয়ার ইঙ্গিত করে দেখিয়ে আমার হাতে একটা বাল্ব ধরিয়ে দিয়ে বলল, 'এটা একটু লাগিয়ে দিন না! এটার জন্যে খুবই জ্বালাতনে পড়েছি। পুরো বাড়িতে কোনো টর্চ নেই।' একুশ বাইশ বছরের একটা মেয়ে। শাড়ি কাপড়ে কেমন অপ্সরার মতো লাগছে তাকে। বুকের ধুকপুকানি সামান্য বেড়ে গেল।


আমি চেয়ারে উঠে বাল্বটা লাগানোর চেষ্টা করলাম। বেশ উপরে হুক হওয়াতে সামান্য বেগ পেতে হলো।কাজটা করতে করতে কৌতূহলতা থেকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি কী একা এসেছেন?' এবার আমার পুরো শরীর জমিয়ে দিয়ে একটা পুরুষালি গলা ঘর ভরে গমগম করে উঠল, 'আমরা একা কোথাও যাই না! তোরও একা অপরিচিত ঘরে ঢোকা উচিত হয়নি!' আমার হাত থেকে বাল্ব আর টর্চ দুটোই ছুটে পড়ে গেল। আতঙ্কে শিউরে ওঠে নিচে তাকালাম। টর্চটা বন্ধ হয়ে পুরো ঘর তিমিরে ডুবে গেল। তখনই মেয়েটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে জ্বলজ্বলে আগুনের শিখার মতো দুটো চোখ জ্বলে উঠল। সেই শিখার আলোতে যেই মুখটা দেখলাম এটা কোনো মানুষের মুখ হতে পারে না! ওটার কোনো নাক কিংবা মুখ নেই! গোল মুখটার মাঝামাঝি ফুঁড়ে বেরিয়ে আছে দুটো আগুনের শিখার চোখ। গলার সামান্য নিচে একটা ফাক। মনে হলো ওটাই ওর মুখ। চিৎকার করার জন্য আমার সমস্ত শরীর আন্দোলন করে উঠল। 


চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু গলা দিয়ে টু শব্দটি বের হলো না। উল্টো পা ফসকে চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে গেলাম উপুড় হয়ে। অল্পের জন্য মাথাটা মেঝেতে ঠুকতে ঠুকতে ঠুকলো না। আমি ঘুরে মেয়েটার দিকে তাকালাম। ওটার চোখ থেকে বিচ্ছুরিত আলোই ওটার অবয়ব মেলে ধরলো আমার চোখের সামনে।


ওটার লোমশ সারা শরীর গিজগিজ করছে অদ্ভুত এক সাদা পোকায়। অনেকটা কেঁচোর মতো দেখতে ওগুলো। ওটা এগিয়ে আসছে আমার দিকে। ভয়ে আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে, ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝলাম দুটো পা ই বেশ ভালো রকম মুচড়ে গেছে। পালানোর কোনো উপায় নেই। কিন্তু কী এটা! ভ্রম!


এবার নিজের সর্ব শক্তি ব্যয় করে একটা চিৎকার করলাম। নিজের মুখ থেকে বের হওয়া বিকট চিৎকার পুরো ঘরময় এমন ভাবে ভারী খেয়ে কেঁপে উঠল যে নিজেই চমকে উঠলাম। মেয়েটার হাত থেকে বাল্বটা নেয়ার আগে হাতে করে আনা লাঠিটা মেঝেতে ফেলে ছিলাম। অন্ধকার হাতড়ে ওটার নাগাল পেলাম। অদ্ভুত প্রাণীটার শরীর ঝুঁকতে লাগলো আমার দিকে। লোমশ শরীরের আড়াল থেকে ওর দুটো স্তন উন্মুক্ত হয়ে গেল আমার সামনে। লাঠিটা সজোরে এগিয়ে এনে আঘাত করলাম ওটার বুক বরাবর। ওটা অশরীরী নয়! সামান্য আর্তনাদ তুলে পিছিয়ে যেতে লাগলো ওটা পেছনে। আমি আবার চিৎকার করলাম। শরীরে সামান্য যে শক্তি ছিল তার সাথে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে হাতের উপর ভর দিয়ে মেঝে টেনে টেনে শরীরটাকে বারান্দায় এনে হাজির করলাম। বারান্দার বাল্বটাও বন্ধ হয়ে আছে। কয়েকজন মানুষের ছুটে আসার আওয়াজ পেলাম। আমার চিৎকার কাজে লেগেছে।আমার বাড়িওয়ালা সহ আশেপাশের অনেকেই গেটের সামনে থমকে দাঁড়ালো। একসাথে কয়েকটা টর্চের আলো আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।


কিন্তু তারা কেউ ভেতরে আসতে পারলো না। কারণ গেটটা বাইরে থেকে তালা দেয়া। তারা বিস্মিত হয়ে বাইরে থেকে চেচাতে লাগলো, জানতে চাইলো কী করে আমি ভেতরে ঢুকলাম তালা না খুলে! আমাকে এমন কাহিল অবস্থায় দেখে তারাও ঘাবড়ে গেছে। অবশ্য তারা বেশিক্ষণ লাগালো না তালাটি ভেঙে আমাকে উদ্বার করতে। কোনো জবাব দেয়ার মতো অবস্থায় আমি ছিলাম না।চোখ দুটো বন্ধ করলাম। এক মৃত্যু আতঙ্ক আমার শরীরটাকে পুরোপুরি অবশ করে ফেলেছিল। 


পা দুটো ভালো হতে প্রায় মাস পেরিয়ে গেল। আমি অবশ্য ঘটনার পর দিনই সেই ঘর, এলাকা ছেড়ে ভয়েই এক প্রকার পালিয়েই এসেছিলাম। সেই বীভৎস ভয়ঙ্কর চেহারা আর শরীরটা বা রাতের কথা যখনই মনে উদয় হতো আমার শরীরটা কেঁপে উঠত। কত রাতে দুঃস্বপ্নে এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল ওই প্রাণীটা আমার! এরপর থেকে এই পর্যন্ত অন্ধকার ভীতি দূর করতে পারিনি আমি। এখনো আলো জ্বেলে ঘুমাতে হয় আমাকে। 


যেই লোকগুলো সেরাতে আমাকে উদ্ধার করেছিল তাদেরকে আমার কাহিনী বললে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেনি তখন। আবার আমিও যে কিভাবে বাড়িতে ঢুকেছিলাম সেই কিনারাও করতে পারেনি। অনেক বছর পর যখন সেই এলাকায় আবার ফিরে গিয়েছিলাম তখন জানতে পারি আমি চলে যাওয়ার পর থেকে ওই বাড়িটার উত্তরাধিকারীরা ওখানে ফিরে এসে পরিত্যক্ত বাড়িটা ভেঙে বহুতল বিল্ডিং করার আগ পর্যন্ত সেই বাড়ির আশেপাশের অনেক ঘরের লোকেরাই মাঝরাতে জানলায় টোকা, ধাক্কানোর আওয়াজ পেয়েছিল, কেউ কেউ মধ্যরাতে সেই পরিত্যক্ত বাড়ির ঘরে আলো জ্বালা অবস্থাতেও দেখেছে। কয়েকজন একটি রূপসী মেয়ের অবয়বও দেখেছিল খোলা জানালা দিয়ে। আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা জেনে অনেকেই পুর্ব থেকে সতর্ক থাকায় বিপদে পড়েনি যদিও। 


অবশ্য আমি যা দেখেছিলাম সেরাতে, সেই দৃশ্যটা তারা কেউ দেখেনি। আমি চাইওনা ওটা আর কেউ দেখুক। চাই না, কারও ঘরের জানলায় মধ্যরাতে পড়ুক অচেনা জগতের কারও টোকা! 


(সমাপ্ত) 

গল্প- ব্যাখ্যাহীন

 #ব্যাখ্যাহীন

লেখা: #Masud_Rana

ময়লা শার্টের সাথে ধবধবে পরিষ্কার সাদা লুঙ্গিতে লোকটাকে বেমানান লাগছে। চুল এবং দাড়িও উস্কোখুস্ক। রিমি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে আড়চোখে তাকালো। নাকটা সামান্য কুঁচকে আছে তার। কেমন একটা বিশ্ৰী গন্ধ আসছে লোকটার শরীর থেকে। সে দাঁড়িয়ে ছিল লেগুনা স্টেশনে। একটা লেগুনা গাড়ির অপেক্ষায় বাড়ি ফেরার জন্য। হঠাৎ কোত্থেকে লোকটা এসে তার একদম গা ঘেষে পাশে দাঁড়ালো। আচমকা লোকটা তার বাম হাতটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরতেই রিমি প্রায় শিউরে উঠে আতঙ্ক ভরা দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালো। লোকটার মুখে সরল,অদ্ভুত মিষ্টি একটা হাসি লেগে রয়েছে। 


রিমি চিৎকার করতে গিয়েও তাই থেমে গেল। লোকটা কী তার পরিচিত! বা কোনো অর্থ সাহায্য চায়! সে লোকটাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, লোকটার দুই হাত এবার আরো শক্ত হয়ে চেপে ধরলো তার হাত। হঠাৎ তার মনে হলো তার শরীরে যেন জোরে কিছু একটার ধাক্কা এসে লাগলো পেছন থেকে। রিমির চোখ দুটো বড় হয়ে গেল আতঙ্কে। এরপরই চারপাশের সব কিছু তার কাছে আধার হয়ে এলো। অন্ধকারের জগতে ডুবে গেল সে। যখন চোখ খুললো তখন দেখল, লেগুনা স্টেশনের সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে সে। কিন্তু সেই লোকটা আশেপাশে কোথাও নেই। সে দ্রুত হাত ঘড়িটা দেখল। ঘড়িতে বিকাল ৫টা ২০ বাজে। ঘড়ির সময়ে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু কেন যেন তার মনে হচ্ছে লোকটা তার হাত ধরার পর কয়েক ঘণ্টা সময় কেটে গেছে। এই কয় ঘন্টা সে অন্ধকারে ডুবে ছিল। খুবই অদ্ভুত!


লেগুনা চলে আসায় সে দ্রুত ওটায় উঠে পড়লো। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে এরমধ্যে। ৫টা ৫০ মিনিটে সে লেগুনা থেকে নামলো। একটা রিকশায় উঠে বসলো। ২০ মিনিট পরই সে তার বাড়ির সামনে পৌঁছে যাবে। সপ্তাহে ৫ দিন এটাই তার রোজকার বিকালের রুটিন। ঘড়িতে ৬টা বাজে। রিকশা-ওয়ালা মাঝপথে রিকশাটা থামিয়ে রিমিকে বলল, সে এক মিনিটের জন্য সামনের পানের দোকানটায় যাবে আর আসবে। রিমি মাথা ঝাকিয়ে স্বায় দিল। 


লোকটা পানের দোকানে গিয়েছে দুই মিনিট হবে। এমন সময় একটা চিৎকার শুনলো সে। রাস্তার পাশে চিৎকার করা লোকগুলোর দিকে তাকাতেই তার সমস্ত বুক কম্পিত হয়ে উঠল। লোকগুলো তার দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছে। কিছু একটা বলছে তাকে। কিন্তু সম্মিলিত চেঁচানোর মিশ্র শব্দে কিছুই সে বুঝতে পারলো না। তার মাথা ঝট পাকিয়ে যেতে লাগলো। লোকগুলোর চোখে মুখের আতংক কিছু না বুঝেও তার ভেতর স্থান্তরিত হয়ে গেল। তার নিজের সমস্ত ইন্দ্রিয় তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেন একটাই বার্তা দিল তাকে। ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটবে তোমার সাথে, এটাকে আটকানোর সময় পার হয়ে গেছে। তীব্র একটা ধাক্কা খেল রিকশাটা। পেছন থেকে আসা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়া প্রাইভেট কারটির ধাক্কায় প্রথমে রিকশা থেকে নিচে পড়ে রাস্তার সাথে প্রচণ্ড ধাক্কা খেল তার শরীর। পরমুহূর্তেই নিয়ন্ত্রহীন গাড়িটি দুটি চাকা তার পিঠের উপর দিয়ে উঠিয়ে দিয়ে চলে গেল আরও সামনে। থেঁতলে গেল তার শরীর। শরীর মুচড়ে যাওয়া আর শরীরের হাড় ভাঙার প্রচণ্ড ভয়ানক ব্যথা আর অনুভূতি তাকে একমুহূর্তে করে তুললো অনুভূতিহীন। সমস্ত কিছুর উর্ধে। সে মৃত্যুকে অনুভব করলো তার খুব কাছে। মাথার পেছন দিক থেকে ওটা ফিসফিস করছে। চোখের চারপাশে আধার নেমে এলো তার।


হঠাৎ খালি হয়ে যাওয়া ফুসফুস যেন ভরে গেল অদ্ভুত কোনো উপায়ে। শরীরে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত করলো সে আবার। এখনো সব অনুভূতি শেষ হয়ে যায়নি তবে। চোখ খুললো সে। অবাক হয়ে দেখল দাড়িয়ে আছে সে লেগুনা স্টেশনে। তার বাম হাত চেপে ধরে আছে সেই সাদা লুঙ্গি আর ময়লা শার্ট পরা লোকটা। তার মুখে সেই হাসি। এতক্ষণ তাহলে কী ঘটলো তার সাথে। সবটাই কী! লোকটা এবার তার হাত ছেড়ে উল্টো ঘুরে হাটতে হাটতে ঢুকে গেল একটা গলিতে। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিমি। ঘড়িতে এখনো বাজে ৫টা ২০। একই সময়। অথচ তার মনে হচ্ছে কত ঘণ্টা কেটে গেছে। তখনই তার সামনে এসে থামলো একটা লেগুনা। রিমি ধীর গতিতে হেঁটে ওটায় উঠে বসলো। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। লোকটা তাকে কী দেখিয়েছে এটা! ৫টা ৫০ মিনিটে লেগুনা গন্তব্যে এসে থামলো। রিমি নেমে গেল। এবার রিকশায় উঠতে হবে তাকে। 


তার মাথাটা চক্কর দিচ্ছে যেন মাথার ভেতর। কিছুটা এগোতেই দেখল, রাস্তার মোড়ে একটিমাত্র রিকশা দাঁড়িয়ে রয়েছে। রিকশাটা কিংবা রিকশার মালিককে অপরিচিত লাগলো না তার কাছে। অথচ বাস্তবে সে জানে জীবনে এই প্রথম লোকটাকে দেখল। রিকশাটা তার দিকে এগিয়ে আসতেই ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে এলো। এইতো সেই রিকশা। সে উল্টো হেঁটে পেছাতে লাগলো। ভয়ে তার চোখ ফেটে মণি বেরিয়ে আসবে বুঝি। পেছাতে পেছাতে একটা ইটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ফুটপাথে বসে পড়লো। আর ওঠার শক্তি পেল না। সে অনুভব করলো তার মস্তিস্ক আর কাজ করতে চাইছে না। যতক্ষণ না আর কোনো যাত্রী পেয়ে রিকশাটা খালিই চলে গেল ততক্ষণ এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলো সে। এরপর মাটির দিকে তাকিয়ে ঝিম মেরে সেখানেই বসে রইলো সে। 


কতক্ষণ সময় বয়ে গেল জানে না সে। শরীরে কারও স্পর্শে তার ধ্যান ভাঙলো। তার বাবা ফুঁপিয়ে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরলো। ঘড়ির কাঁটায় রাত ১০টা। রিমি নিজেকে আবিস্কার করলো সেই ফুটপাতেই। এতটা সময় বয়ে গেছে! বাড়ির লোকজন কতবার তাকে কল করেছে, সে টেরই পায়নি। বাবা তাকে ধরে দাঁড় করালেন। সে বাবার উদ্বেগের প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিতে পারলো না।


হঠাৎ সে দেখলো একটা পুলিশের গাড়ি রাস্তার ভেতর দিক থেকে এগিয়ে আসছে বড় রাস্তার দিকে। ওটার পেছনে একটা মিনি ট্রাক তুবড়ে যাওয়া একটি প্রাইভেট কার নিয়ে এগিয়ে আসছে। সে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। বাস্তবে কিছুই জানে না সে। কিন্তু এই গাড়ির এই অবস্থা কী করে হলো তা সে স্পষ্ট যেন দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে। আচ্ছা আজ তার সাথে আসলে কী ঘটলো! আজ কী তার মৃত্যু তার জন্য অপেক্ষা করছিল! তার অনুপস্থিতে তার জায়গায় এই প্রাইভেট কারটি অন্য কোনো মানুষের জীবন কী নিয়েছে! নাকি খালি রিকশাটাই শুধু ওটার আঘাত সহ্য করেছে! বা পুরো বিষয়টার সাথে তার কিংবা এই রিকশাটির আর কোনো সম্পর্কই নেই! আর সেই লোকটা! 

(সমাপ্ত)

How to Add Custom Robots Header Tags?

 

How to Add Custom Robots Header Tags?


 you want to make your blog discoverable by search engines, then you must need to setup blogspot robots headers tags. You must follow these steps and complete your target.

Step 1: To start this journey, you need go to blogger.com and choose your blog which you need to setup this SEO strategy.

Step 2: Now go to Settings >> Search preferences >> Custom robots header tags >> Now click on Edit.

Step 3: Now you will see Yes or No option. Click on the Yes option and there will be many options.

will be many options. Just mark these options same to same following image:

Customize Blogspot Robots Header Tags

Step 4: After mark these options, just click on Save changes and you are all done!

Finally I want to said that, make sure your blog has enough content. Because quality content is boss and without this element, you can rank. Just write some quality articles first and then submit your blog for indexing. But before launching your website, you must complete these robots header tags on blogger. Cheers!


Blogger Custom Robots Header Tags

 Blogger Custom Robots Header Tags


Want to increase your blog ranking or drive extra organic traffic? You must use an excellent custom robots header tags in blogger. Because it’s most important factor to getting rank your every keywords in Google’s page. In my previous post, I discuss about blogger robots.txt file and it’s another important Search Engine Optimization fact.

Your blog has many things which not important for Google or ranking. You must nofollow some links or pages. If your every pages will index, then it’s will effect on your SEO. Because archive and search pages not for SEO, it’s only for readers. There are many more things which must need to learn first. In this article, you able to know the complete tutorial about crawlers and indexing settings in blogger.

What is Robots Header Tags?

Header tags helps to hide or show important pages or posts in search engine. Using these, you can rank on Google or hide pages also from SERP. Before starting this chapter, you must need to know about followings tags:

1. all – If you really want to make visible your whole blog, you must activate this option. Because that allow search engine to crawl your whole blog contents.

2. noindex – If you need to never index your whole page or search, archive pages, then you can choose this option. Because it can help to hide your pages, posts from search results.

3. nofollow – There have two options in search engine optimization. Follow and Nofollow! Nofollow completely hide your links from crawlers.


4. None – You can make your whole blog undiscovered from Google, Bing or Yahoo. They never crawl your blog & also never give rank.

5. noarchive – When we search on Google, then we noticed that there have an option called Archived under SERP. If you use this tag, then search engine never save your site in archive file.


6. nospippet – When readers search on Google, they saw an smart description under posts title. If you want to hide this meta description/snippet from SERP, then you may use this tag.


7. noodp – There has many open directory around internet. You can control them from your robots file.


8. notranslate – Some readers from foreign country with their own language. If they want to read your blog, then they must need to use translate. But if you want to disable translate option for them, then you can use that tag.


9. noimageindex – Image search engine optimization important strategy of blogging. Because image search also drive extra traffic. If you mark this, then your blog images never shown on search engine.


10. unavailable_after – If you want to show some content for limited time, then you can use this. After expire the time, you content will automatically hide from Search Engine Results Page.

ভ্যাম্পায়ার কিং

 ১৮৬৫সাল...

.
ডেয়ার ডেইমেন
আশা করি ভালো আছো, আমিও ভালো আছি, কিন্তু ততটা ভালো নেই, তোমার ছোট ভাই যতটা ভালো থাকবে বলে তুমি আশা কর। মা মারা যাবার পড় থেকে তুমি আর্মি তে। বাবাও প্রতি দিন রাতে মদ খেয়ে বাসায় ফিরে। ছোট মা আমাকে খুব বকা ঝকা করে, মাঝে মাঝে মার ও দেয়। ছোট মা একদম ভালো না, আমার একটুও ভালো লাগেনা। আমার খুব একা একা লাগে, কিছুই ভালো লাগে না। কি করব কিছুই বুঝে আসে না। যদি তুমি থাকতে তাহলে খুব ভালো হত। ভালো থেকো, নিজের যত্ন নিও। তোমার প্রিয়
স্টেফেন সেল্ভেটর
.
০২
জন= কি ডেইমেন, কার চিঠি??
ডেমন= আমার ছোট ভাই, ও খুব সমস্যায় আছে, আমাকে যেতে হবে।
জন= যুদ্ধ চলাকালিন সময় তুমি ছুটি পাবেনা।
ডেমন= আমাকে কর্নেল এর সাথে কথা বলতে হবে
.
০৩
ডেমন= স্যার, আমার এক সপ্তাহের জন্য ছুটি লাগবে। আমার ছোট ভাই খুব সমস্যায় আছে।
কর্নেল= এই মুহূর্তে কাউকে ছুটি দেয়া সম্ভব না।
ডেমন= স্যার আমার খুব দরকার
কর্নেল= ঠিক আছে, আমি তোমাকে এক সপ্তাহের ছুটি দিব। কিন্তু তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে।
ডেমন= কি কাজ??
কর্নেল= জঙ্গলের ভিতরে একটি বাড়িতে একটি সন্ত্রাসী দল আত্মগোপন করে আছে, তাদেরকে জীবিত গ্রেফতার করতে হবে।
ডেমন= ওকে স্যার।
কর্নেল= তবে কোন বেসামরিক লোকের যেন কোন ক্ষতি না হয়।
.
.
০৪
জঙ্গলের ভিতরে কুটিরে কড়া নেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ডেমন। কিছুক্ষন পর ভিতর থেকে একটি ষোল কি সতের বছরের মেয়ে দরজা খুলে দেয়। নীল রঙের চক্ষু বিশিষ্ট মেয়েটি ডেমন কে ভেতরে আসার জন্য বলে।
ডেমন= আমি একজন ক্লান্ত সৈনিক, অনুগ্রহ করে আমাকে একটু পানি পান করাণ।
মেয়েটি= তোমার নাম কি
ডেমন= ডেমন সেল্ভেটর
মেয়েটি= ভিতরে আসো, এখানে কি করতে এসেছ??
ডেমন= কিছু গুপ্ত ঘাতক কে গ্রেফতার করতে এসেছি
মেয়েটি= তার মানে তুমি পানি পান করতে আসো নি, এক কাজ কর...  মেয়েটি নিজের হাতে কামড় দিয়ে কিছু রক্ত বের করে একটা গ্লাসে নেয়। গ্লাস টা ডেমন এর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে= এটা পান কর।
ডেমন কোন কথা না বলে সাথে সাথে গ্লাসের সব রক্ত একবারে খেয়ে  খালি করে দেয় । সাথে সাথে মেয়েটি ডেমনের ঘাড় মোটকে দেয়। ডেমনের শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
প্রায় দুই দিন পর ডেমনের ঘুম ভাঙে।

০৫
ডেমন বাড়িতে আসতেই প্রথমেই ওর সৎ মায়ের সাথে দেখা হয়। সৎ মা ডেমন কে দেখেই চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দেয়।  = একটার জালায় বাচি না, আবার আরেকটা এসেছে মরতে।
ডেমন ওর সৎ মায়ের ঘাড়ে একটা কামড় দিয়ে শরীরের সমস্ত রক্ত শুষে ফেলে। ডেমনের সৎ মা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাঁপতে থাকে। নিথর দেহ টা মাটিতে ফেলে দিয়ে বলতে থাকে= আমি মরতে আসি, I already death.

দূর থেকে সব দেখতে থাকে স্টেফেন। এই নির্মমতাই স্টেফেন নির্বাক হয়ে যায়, আকস্মিক ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে= ডেইমেন!!!!
ডেমন= হ্যালো ব্রাদার
স্টেফেন= তুমি এখানে?? (স্টেফেনের চোখে মুখে বিস্ময় এবং প্রশ্ন ।)
ডেমন= ভেম্পায়ার কিং এখন থেকে এখানেই।

Post no.1

Welcome to Fahim's Blogs guys.

Stay with us.Hope you guys enjoy our blog.


Thanks.

Featured Post

গল্প- একটি_আহ্বান

 লেখা: #Masud_Rana  যে দোকানে দীর্ঘ ১৬ বছর নিষ্ঠার সাথে কর্মচারীর চাকরি করেছে মঈন মিয়া, সেই দোকান থেকেই ৪ লক্ষ টাকা চুরি করে এক রাতে সে উধাও...