#ব্যাখ্যাহীন
লেখা: #Masud_Rana
ময়লা শার্টের সাথে ধবধবে পরিষ্কার সাদা লুঙ্গিতে লোকটাকে বেমানান লাগছে। চুল এবং দাড়িও উস্কোখুস্ক। রিমি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে আড়চোখে তাকালো। নাকটা সামান্য কুঁচকে আছে তার। কেমন একটা বিশ্ৰী গন্ধ আসছে লোকটার শরীর থেকে। সে দাঁড়িয়ে ছিল লেগুনা স্টেশনে। একটা লেগুনা গাড়ির অপেক্ষায় বাড়ি ফেরার জন্য। হঠাৎ কোত্থেকে লোকটা এসে তার একদম গা ঘেষে পাশে দাঁড়ালো। আচমকা লোকটা তার বাম হাতটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরতেই রিমি প্রায় শিউরে উঠে আতঙ্ক ভরা দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালো। লোকটার মুখে সরল,অদ্ভুত মিষ্টি একটা হাসি লেগে রয়েছে।
রিমি চিৎকার করতে গিয়েও তাই থেমে গেল। লোকটা কী তার পরিচিত! বা কোনো অর্থ সাহায্য চায়! সে লোকটাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, লোকটার দুই হাত এবার আরো শক্ত হয়ে চেপে ধরলো তার হাত। হঠাৎ তার মনে হলো তার শরীরে যেন জোরে কিছু একটার ধাক্কা এসে লাগলো পেছন থেকে। রিমির চোখ দুটো বড় হয়ে গেল আতঙ্কে। এরপরই চারপাশের সব কিছু তার কাছে আধার হয়ে এলো। অন্ধকারের জগতে ডুবে গেল সে। যখন চোখ খুললো তখন দেখল, লেগুনা স্টেশনের সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে সে। কিন্তু সেই লোকটা আশেপাশে কোথাও নেই। সে দ্রুত হাত ঘড়িটা দেখল। ঘড়িতে বিকাল ৫টা ২০ বাজে। ঘড়ির সময়ে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু কেন যেন তার মনে হচ্ছে লোকটা তার হাত ধরার পর কয়েক ঘণ্টা সময় কেটে গেছে। এই কয় ঘন্টা সে অন্ধকারে ডুবে ছিল। খুবই অদ্ভুত!
লেগুনা চলে আসায় সে দ্রুত ওটায় উঠে পড়লো। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে এরমধ্যে। ৫টা ৫০ মিনিটে সে লেগুনা থেকে নামলো। একটা রিকশায় উঠে বসলো। ২০ মিনিট পরই সে তার বাড়ির সামনে পৌঁছে যাবে। সপ্তাহে ৫ দিন এটাই তার রোজকার বিকালের রুটিন। ঘড়িতে ৬টা বাজে। রিকশা-ওয়ালা মাঝপথে রিকশাটা থামিয়ে রিমিকে বলল, সে এক মিনিটের জন্য সামনের পানের দোকানটায় যাবে আর আসবে। রিমি মাথা ঝাকিয়ে স্বায় দিল।
লোকটা পানের দোকানে গিয়েছে দুই মিনিট হবে। এমন সময় একটা চিৎকার শুনলো সে। রাস্তার পাশে চিৎকার করা লোকগুলোর দিকে তাকাতেই তার সমস্ত বুক কম্পিত হয়ে উঠল। লোকগুলো তার দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছে। কিছু একটা বলছে তাকে। কিন্তু সম্মিলিত চেঁচানোর মিশ্র শব্দে কিছুই সে বুঝতে পারলো না। তার মাথা ঝট পাকিয়ে যেতে লাগলো। লোকগুলোর চোখে মুখের আতংক কিছু না বুঝেও তার ভেতর স্থান্তরিত হয়ে গেল। তার নিজের সমস্ত ইন্দ্রিয় তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেন একটাই বার্তা দিল তাকে। ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটবে তোমার সাথে, এটাকে আটকানোর সময় পার হয়ে গেছে। তীব্র একটা ধাক্কা খেল রিকশাটা। পেছন থেকে আসা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়া প্রাইভেট কারটির ধাক্কায় প্রথমে রিকশা থেকে নিচে পড়ে রাস্তার সাথে প্রচণ্ড ধাক্কা খেল তার শরীর। পরমুহূর্তেই নিয়ন্ত্রহীন গাড়িটি দুটি চাকা তার পিঠের উপর দিয়ে উঠিয়ে দিয়ে চলে গেল আরও সামনে। থেঁতলে গেল তার শরীর। শরীর মুচড়ে যাওয়া আর শরীরের হাড় ভাঙার প্রচণ্ড ভয়ানক ব্যথা আর অনুভূতি তাকে একমুহূর্তে করে তুললো অনুভূতিহীন। সমস্ত কিছুর উর্ধে। সে মৃত্যুকে অনুভব করলো তার খুব কাছে। মাথার পেছন দিক থেকে ওটা ফিসফিস করছে। চোখের চারপাশে আধার নেমে এলো তার।
হঠাৎ খালি হয়ে যাওয়া ফুসফুস যেন ভরে গেল অদ্ভুত কোনো উপায়ে। শরীরে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত করলো সে আবার। এখনো সব অনুভূতি শেষ হয়ে যায়নি তবে। চোখ খুললো সে। অবাক হয়ে দেখল দাড়িয়ে আছে সে লেগুনা স্টেশনে। তার বাম হাত চেপে ধরে আছে সেই সাদা লুঙ্গি আর ময়লা শার্ট পরা লোকটা। তার মুখে সেই হাসি। এতক্ষণ তাহলে কী ঘটলো তার সাথে। সবটাই কী! লোকটা এবার তার হাত ছেড়ে উল্টো ঘুরে হাটতে হাটতে ঢুকে গেল একটা গলিতে। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিমি। ঘড়িতে এখনো বাজে ৫টা ২০। একই সময়। অথচ তার মনে হচ্ছে কত ঘণ্টা কেটে গেছে। তখনই তার সামনে এসে থামলো একটা লেগুনা। রিমি ধীর গতিতে হেঁটে ওটায় উঠে বসলো। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। লোকটা তাকে কী দেখিয়েছে এটা! ৫টা ৫০ মিনিটে লেগুনা গন্তব্যে এসে থামলো। রিমি নেমে গেল। এবার রিকশায় উঠতে হবে তাকে।
তার মাথাটা চক্কর দিচ্ছে যেন মাথার ভেতর। কিছুটা এগোতেই দেখল, রাস্তার মোড়ে একটিমাত্র রিকশা দাঁড়িয়ে রয়েছে। রিকশাটা কিংবা রিকশার মালিককে অপরিচিত লাগলো না তার কাছে। অথচ বাস্তবে সে জানে জীবনে এই প্রথম লোকটাকে দেখল। রিকশাটা তার দিকে এগিয়ে আসতেই ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে এলো। এইতো সেই রিকশা। সে উল্টো হেঁটে পেছাতে লাগলো। ভয়ে তার চোখ ফেটে মণি বেরিয়ে আসবে বুঝি। পেছাতে পেছাতে একটা ইটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ফুটপাথে বসে পড়লো। আর ওঠার শক্তি পেল না। সে অনুভব করলো তার মস্তিস্ক আর কাজ করতে চাইছে না। যতক্ষণ না আর কোনো যাত্রী পেয়ে রিকশাটা খালিই চলে গেল ততক্ষণ এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলো সে। এরপর মাটির দিকে তাকিয়ে ঝিম মেরে সেখানেই বসে রইলো সে।
কতক্ষণ সময় বয়ে গেল জানে না সে। শরীরে কারও স্পর্শে তার ধ্যান ভাঙলো। তার বাবা ফুঁপিয়ে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরলো। ঘড়ির কাঁটায় রাত ১০টা। রিমি নিজেকে আবিস্কার করলো সেই ফুটপাতেই। এতটা সময় বয়ে গেছে! বাড়ির লোকজন কতবার তাকে কল করেছে, সে টেরই পায়নি। বাবা তাকে ধরে দাঁড় করালেন। সে বাবার উদ্বেগের প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিতে পারলো না।
হঠাৎ সে দেখলো একটা পুলিশের গাড়ি রাস্তার ভেতর দিক থেকে এগিয়ে আসছে বড় রাস্তার দিকে। ওটার পেছনে একটা মিনি ট্রাক তুবড়ে যাওয়া একটি প্রাইভেট কার নিয়ে এগিয়ে আসছে। সে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। বাস্তবে কিছুই জানে না সে। কিন্তু এই গাড়ির এই অবস্থা কী করে হলো তা সে স্পষ্ট যেন দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে। আচ্ছা আজ তার সাথে আসলে কী ঘটলো! আজ কী তার মৃত্যু তার জন্য অপেক্ষা করছিল! তার অনুপস্থিতে তার জায়গায় এই প্রাইভেট কারটি অন্য কোনো মানুষের জীবন কী নিয়েছে! নাকি খালি রিকশাটাই শুধু ওটার আঘাত সহ্য করেছে! বা পুরো বিষয়টার সাথে তার কিংবা এই রিকশাটির আর কোনো সম্পর্কই নেই! আর সেই লোকটা!
(সমাপ্ত)
No comments:
Post a Comment