লেখা: #Masud_Rana
যে দোকানে দীর্ঘ ১৬ বছর নিষ্ঠার সাথে কর্মচারীর চাকরি করেছে মঈন মিয়া, সেই দোকান থেকেই ৪ লক্ষ টাকা চুরি করে এক রাতে সে উধাও হয়ে গেল। বিষয়টা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না কেউ। এমন কী সেই পাইকারি মুদি মালের দোকানের মহাজন নেসার ব্যাপারীও হারানো টাকার কথা উল্লেখ করে একটা জি.ডি. করলেও সেখানে মঈন মিয়ার নামে চুরির অভিযোগ করলেন না। তার ভাষায় মঈন মিয়া টাকা চুরি করার লোক না। মঈন মিয়াকে তিনি আপন কাকা মানেন। ঈদের কয়েক দিনে পাইকারি মুদি মালের দোকানগুলোতে বিক্রি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সেখান থেকেই ৪ লক্ষ টাকা চালের চালানের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তিনি নিজে এত বছরের বিশ্বাস থেকেই টাকা গুলো তুলে দিয়েছিল মঈন মিয়ার হাতে।
বাজারের অন্য সব লোকেরাও মঈন মিয়াকে একজন সৎ কর্মচারী হিসেবেই চেনে। সে কেন শেষ বয়সে এসে এমন কাজ করবে! মঈন মিয়ার টাকার খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। অনেক আগেই স্ত্রীকে হারায় সে। নিজের মা আর সে দায়িত্ব নিয়েই বড় করে তোলে তিন মেয়েকে। খুব একটা পড়াশোনা করাতে না পারলেও তিনজন ভালো পাত্রের হাতে তাদের সমর্পণ করে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা পালন করেছে সে। মঈন মিয়ার মাও মারা গিয়েছে ২ বছর হলো। এখন একাই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতো লোকটা। পিছুটান কিংবা উচ্চাসা এই লোকটার জীবনে কিছুই ছিল না।
তাই সে যে চুরি করেনি সেটা নিয়ে সকলে নিশ্চয়তা দিচ্ছে। আবার মঈন মিয়ার টাকা সহ উধাও হয়ে যাওয়ার হিসাবও কেউ মিলাতে পারলো না। তার তিন মেয়ে ছুটে আসে বাবার নিখোঁজের কথা শুনে। তাদের কারো কাছেও যায়নি লোকটা। যত জায়গায় খোঁজা সম্ভব সব জায়গাতেই খোঁজ নেয়া হলো তার। কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেল না তাকে।
এর একটা খারাপ ইঙ্গিতও রয়েছে। যা ভেবেই সকলে দুশ্চিন্তা করছে বেশি। মঈন মিয়াকে হত্যা করে কেউ তার থেকে টাকা গুলো ছিনিয়ে নিয়েছে। এতগুলো টাকার কথা জেনে নিম্নবিত্ত যে কোনো লোভী মানুষের পক্ষে কাজটা করা অসম্ভব নয়। যদিও মঈন মিয়ার কাছে টাকা রাখার কথাটা কাউকেই তেমন ভাবে জানায়নি মহাজন নেসার বেপারী। তবুও টাকার কথা বাতাসে ছড়ায়। মঈন মিয়ার সেরাতে গোডাউনেই ঘুমানোর কথা ছিল। দোকানের কোনো কর্মচারীও করতে পারে কাজটা!
পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে সবাইকেই। কিন্তু কোনো তথ্যসূত্রই পায় না। প্রায় মাস খানিক কেটে যাওয়ার পরেও মঈন মিয়ার কোনো খোঁজ মিলল না। সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তাও কেউ জানে না। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে চঞ্চলতা কমে যেতে লাগলো বড় বাজারে।
এক রাত। পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন নেসার ব্যাপারী। তার মুদির দোকানটা বড় বাজারে হলেও আদি ভিটা এখনো ছাড়েননি তিনি। গ্রামীন এক পরিবেশের ভেতরেই তার বসতবাড়ি। দুই পাশে ধান ক্ষেত তার মাঝের যে রাস্তাটা ধরে হাঁটছেন তিনি সেটার শেষ মাথাতেই তার বাড়ি। রাতে এদিকে রিকশাওয়ালারা আসতে চায় না। রাস্তার শুরুতে তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে বেটা। তিনিও অন্যদিনের মতো ঝগড়া করলেন না। জোৎস্নার আলোতে, ফুরফুরে বাতাসে তার হাঁটতে খারাপ লাগবে না। অনেকটা পথ হেঁটে আসার পর তার মনে হলো কিছুক্ষণ ধরে কেউ তাকে অনুসরণ করছেন। পেছনে ঘুরে ভালোমতো তাকালেন তিনি। কেউ নেই। আরেকটু হেটে যাওয়ার পর আবার ঠিক একই রকম একটা অনুভূতি হওয়ায় আবার পেছনে ঘুরে তাকালেন তিনি।
দূরে একটা বৃদ্ধ লোককে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলেন তিনি। লোকটা যেন হওয়ায় ভেসে এসে উপস্থিত হয়েছে। তিনি গলার স্বর চওড়া করে চেঁচালেন, 'কে মিয়া ভাই? পরিচয়?'
লোকটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। কাছে আসতেই তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। মঈন মিয়া! কেমন মন মরা, ফ্যাকাসে চেহারা হয়েছে তার। এক মাস নিখোঁজের পর কোথা থেকে উদয় হলো! তিনি ছুটে কিছুটা এগিয়ে গেলেন সামনে, 'মঈন কাকা!'
মঈন মিয়ার আর্দ্র কন্ঠ, 'বাজান!' বলে ফুঁপিয়ে উঠল।
নেসার ব্যাপারী বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'কই ছিলা তুমি কাকা! খুঁইজা হয়রান আমরা!'
মঈন মিয়ার কণ্ঠে সেই একই সুর, 'বাজান! ও বাজান!'
'কী হইছে তোমার, কাকা!'
'বাজান ! ও বাজান! বাজান গো!' ফুঁপিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো বৃদ্ধ মঈন মিয়া। আর কোনো শব্দই উচ্চারণ করছে না সে ওটা ছাড়া। বিহ্বল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন ব্যাপারী। বয়স্ক মানুষের এমন আচরণে তার মনটাও কেমন সিক্ত হয়ে উঠল। বললেন, 'ওই টাকার কথা ভুইলা যাও কাকা! যা গেছে গেছে! এখন লও বাড়িতে! কয়ডা খাইয়া জিরাও। চেহারা তো শেষ হইয়া গেছে গা তোমার!'
'বাজান ! ও বাজান!' বৃদ্ধ যেন কষ্টে ভুগে আকুতি করছে তার কাছে কিছু একটা।
নেসার ব্যাপারী এগিয়ে গেলেন বৃদ্ধের দিকে। তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেবেন। লোকটার গা স্পর্শ করতে গিয়ে তার হৃদপিণ্ড যেন লাফিয়ে বুক ছিড়ে বের হয়ে আসতে চাইলো। কোথায় মঈন মিয়ার শরীর! তার হাত মঈন মিয়ার শরীর বেদ করে বাতাস কেটে বেরিয়ে এলো। কোনো শরীর নয় তার সামনে, দাঁড়িয়ে আছে মঈন মিয়ার অবয়ব। তিনি আৎকে উঠে পিছিয়ে গেলেন।
মঈন মিয়া মারা গিয়েছে! আর তার প্রেতাত্মা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে পেরেই তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ইচ্ছা করলো উল্টো ঘুরে দৌড় দিতে বাড়ির দিকে! নিজেকে কিছুটা সংযত করে বললেন তিনি, 'কেমনে হইলো এসব, কাকা? কে করলো?'
এবার বৃদ্ধ মঈন মিয়ার মুখে ক্রোধ ভর করলো, 'বাজান! ও বাজান! বাজান গো!'
বিস্ময় নিয়ে ব্যাপারী তাকিয়ে রইলেন মঈন মিয়ার দিকে। মঈন মিয়াও করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। হঠাৎ সে হাত ইশারা করে ঘুরে রাস্তার পাশ থেকে ধান ক্ষেতের আইলে নেমে পড়লো। একবারও পেছনে না তাকিয়ে হাঁটতে লাগলো সোজা। নেসার ব্যাপারী দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পিছু নিলেন প্রেতাত্মাটার। কেন যেন মনে হচ্ছে বৃদ্ধ মঈন কাকা তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। একদম সাধারণ মানুষের মতো হেঁটে চলেছে লোকটা। তবুও এক আতঙ্ক ঢেকে রেখেছে যেন পরিবেশটাকে।
বুকে সারাক্ষণ ধুকপুকানি নিয়েও কী একটা নেশায় হেঁটেই চললেন তিনি তার এক সময়ের বিশ্বস্ত কর্মচারীর পিছু পিছু। হাঁটতে হাঁটতে এসে তিনি হাজির হলেন ধান ক্ষেতের শেষের এক পুরোনো ডোবার কাছে। বিস্মিত হয়ে খেয়াল করলেন বৃদ্ধ মঈন মিয়া নেই কোনোখানে! শূন্যে মিশে গেছে!জোৎস্নার আলো,পরিত্যাক্ত এই ডোবার পানির পঁচা গন্ধ আর অদ্ভুত শুন-শান নীরবতা তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুললো। শরীর গুলিয়ে উঠল তার। চারপাশের সব কিছু কাঁপতে লাগলো তার দৃষ্টিসীমার। কম্পিত দৃশ্যেই ডোবার দিকে চোখ পড়তেই দেখলেন ডোবার পানির একটা অংশে বুদবুদ উঠছে। আচমকা ওখান থেকে ভেসে উঠল একটা মানুষের শরীর! মাথা থেতলে ঘিলু বেরিয়ে গেছে ওটার। নাক-মুখ মিশে গেছে খুলির সাথে। হাত-পা কুণ্ডুলি পাকিয়ে রয়েছে পেটের সাথে। ভয়ঙ্কর একটা লাশ! ওটার চোখ খুলে গেল হঠাৎ। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে। মঈন মিয়া! সেই মায়াবী করুণ দৃষ্টি! লাশটার ফুপানো কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো, 'বাজান! ও বাজান! বাজান গো!'
আর কিছু ভাবতে পারলো না নেসার ব্যাপারী। উল্টো ঘুরে ছুটতে লাগলেন রাস্তার দিকে উন্মাদের মতো। প্রতি মুহূর্তে পেছন থেকে তার কানে ভেসে আসতে লাগলো যেন সেই করুণ আহ্বানেরকম্পন, 'বাজান! ও বাজান!'
মঈন কাকা ভালোবেসেই তাকে 'বাজান' বলে ডাকতো। একরাতে এই সুন্দর পুত্রসম সম্বোধনটাই যে তাকে এতটা ভয় পাইয়ে তাড়া করে বেড়াবে কোনোদিন মাথায় আসেনি তার।
ছুটতে ছুটতে বাড়িতে যখন তিনি পৌঁছালেন তখন তার দেহ আর মন শক্তির শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে। চিৎকার করে একবার স্ত্রীর নাম বলে ডেকে জ্ঞান হারালেন তিনি।
পরদিন নেসার ব্যাপারীর কথামতো সেই ডোবায় অনুসন্ধান করা হয়। এবং সকলেই আশ্চর্য্য হয়ে যায় একটা পঁচা-গলা লাশ খুঁজে পেয়ে। সবচেয়ে বেশি অবাক হন নেসার ব্যাপারী নিজেই। লাশটা যে মঈন মিয়ার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পুলিশ লাশটা নিয়ে যায়। কিন্তু তখনো খুনি কে তা অধরাই রয়ে যায়।
এরপর থেকে নেসার ব্যাপারীর জীবনে কিন্তু নেমে এলো এক অভিশাপ। শব্দের আহ্বানের অভিশাপ। তিনি ঘুমের ভেতর, জেগে থেকে প্রায়ই কানের পেছন দিক থেকে সেই শব্দটা ভেসে আসছে শুনতে পান। মঈন মিয়ার সেই করুণ কণ্ঠের মায়াবী সম্বোধন, 'বাজান!ও বাজান! বাজান গো!' তার মনে হয় এই শব্দগুলোই তাকে পাগল বানিয়ে দেবে। কাউকেও ভয়ের এই কথাটা না জানালেও তার ব্যবসা, পরিবার সব কিছু থেকে মন উঠে যেতে থাকে তার। তীব্র মানসিক যন্ত্রনায় ভুগতে লাগলেন।
একদিন তিনি খেয়াল করলেন 'বাজান' বলে তাকে মঈন কাকা নয় শুধু। আরেকজনও ডাকে। তার মেজ ছেলে আমজাদ ব্যাপারী! যাকে সে কয়েক মাস আগে বাড়ি ও দোকান থেকে এক প্রকার বেরই করে দিয়েছিলেন। বদ বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে দোকান থেকে প্রায়ই টাকা সরাতো তার অগোচরে সে। মঈন মিয়ার সাহায্যেই অবশ্য একদিন হাতে নাতে ধরেন তিনি ছেলেকে। গত কয়েক মাসে দোকান থেকে ৫০ হাজার টাকা সরিয়েছে ছেলের স্বীকারোক্তি পেয়ে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন তিনি। জুতা মারতে মারতে মারতেই বাজারের সবার সামনে দোকান থেকে বের করে দেন তাকে। বাড়িতে ঢোকার নিষেধাজ্ঞা জারী করেন।
আমজাদ কী কাজটা করেছে! তার সঙ্গে ভুলেও ঐ অপমানজনক ঘটনার পর থেকে দেখা করে না ছেলেটা। তবে তিনি লোক মারফত শুনেছেন কয়েক সপ্তাহ হলো একটা গরুর খামার শুরু করেছে ছেলেটা বাছুর গরু নিয়ে। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে বলে, বন্ধুদের সাথে শেয়ারে কিস্তি নিয়ে শুরু করেছে আমজাদ ওটা। তখন অতো পরোয়া করেননি তিনি। কিন্তু এখন সব কিছু যেন পরিস্কার হতে লাগলো। আমজাদের খামারের টাকার উৎস আর মঈন মিয়ার টাকা সহ উধাও হয়ে যাওয়ার হিসেব যেন মিলে গেল।
তার স্ত্রীকে সরাসরি বললেন তিনি। আমজাদ খুন করেছে মঈন মিয়াকে আর হাতিয়ে নিয়েছে টাকা। তিনি পুলিশে যাবেন। তার স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, 'ছোট মানুষ ভুল করে ফেলেছে! ওরে তুমি মাফ করে দাও! তোমার নিজের পুলা! ওয় খুন করতে চায় নাই! টাকা চুরি করতে চাইছিল শুধু! বুড়া মঈন মিয়াই ওরে চিন্না ফেলে আর চেঁচামেচি করা শুরু করে। ভয় দেখায় পুলিশের! ওর বন্ধুরা খেইপা গিয়া কাজটা করে। মাফ করো তুমি!'
স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। তিনি কেবল সন্দেহ করেছিলেন ব্যাপারটা। কিন্তু তার স্ত্রী সব জানতো আগে থেকেই! ছেলেটা নিশ্চই এসে বলেছে তাকে।তার ধারণাই ঠিক! তার ছেলেই তবে খুনি! মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল তার। গোলমাল ঠেকতে লাগলো সব কিছু। তার নিজের ছেলে! এসব দুশ্চিন্তার মাঝেও কানের কাছে ফিসফিসানি সেই শব্দ এখনো নিস্তার নেয়নি। বেজেই চলেছে মঈন মিয়ার কণ্ঠে, 'বাজান! ও বাজান! বাজান গো! বাজান রে বাজান! বাজান! বাজান!'
তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি জানেন তার মেজ ছেলে খুনের শাস্তি না পেলে এই করুণ শব্দটা থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তার নিস্তার নেই। কিন্তু যত যাই হোক আমজাদ তার ছেলে! দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে কাটতে লাগলো তার দিন। তার দ্বিধা দূর করে দেয়ার জন্যই যেন তার কানের কাছে দিন রাত অবিরাম ভাসতে সেই ডাক, 'বাজান, ও বাজান!'
(সমাপ্ত)